১২:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

হামলাকারীরা বলছিল, টাকা দাও না হলে বাড়িঘর ভেঙে দেব।

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৩:০৫:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ জুলাই ২০২২
  • / ৭৫৬ বার পড়া হয়েছে

bdopennews

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় হিন্দু বসতিতে হামলার বিবরণ দিয়ে একজন ভুক্তভোগী ফেসবুক পোস্টে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি আজ ঢাকায় এক সভায় যোগ দিয়ে সেই রাতের বর্বরতার কথা তুলে ধরেন। উপজেলার দিঘলিয়া গ্রামের বাসিন্দা হ্যামলেট সাহা জানান, হামলার সময় তাদের পরিচিত অনেকেই অপরিচিত হয়ে হাজির হয়।

হ্যামলেট বলেছিলেন যে যেভাবে সাম্প্রদায়িক অবমাননা দেওয়া হয়েছে, সে এখন তার গ্রাম এবং দেশের কাছে অপরিচিত বলে মনে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এই সাম্প্রদায়িক হামলা থেকে আশেপাশের গ্রামের মুসলমানরা তাদের রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছে। পুলিশ আসার পরও হামলা না থামানোর বিষয়ে ঘটনার সময় হামলাকারীদের তুলনায় পুলিশের সংখ্যা খুবই কম বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা: নাগরিক প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক সভায় বক্তব্য রাখেন দিঘলিয়ার সাহাপাড়ার বাসিন্দা হ্যামলেট সাহা। ১৫ জুলাই তাদের বাড়িতে হামলার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে।

ঘটনার বিবরণে হ্যামলেট সাহা বলেন, যে ফেসবুক আইডি থেকে ওইদিন গালাগালি করা হয় সেটি আগের দিন রাত আটটার দিকে খোলা হয়। পরদিন দুপুর আড়াইটার দিকে স্থানীয় লোকজন যারা বাজারে ছিল, তারা সবাই লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এরপর তারা সবাই দোকানপাট বন্ধ করে দেয়। তার বাবা শিবনাথ সাহা ওই গ্রামের সভাপতি। সবাই ভয়ে বাসায় চলে এলো। তখন তার বাবা সবাইকে শান্ত হতে বলেন। তারা নিজেরা এভাবে কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে ২০০ থেকে ৩০০ লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আসে। তারা তার বাবাকে খুঁজতে থাকে।

হ্যামলেট বলল, ‘তখন আমি সামনে দাঁড়ালাম। তারা বলল, মালাউনের সন্তানরা, তোমরা আমাদের দেশের নবীর নামে এসব কথা বলছ। তখন আমি বললাম, এটা ফেক আইডি থেকে। তখন পেছন থেকে 17-18 বছর বয়সী ছেলেরা এসে বলল, আগে মাতবর ও তার ছেলেকে নিয়ে এসো। হ্যামলেট বলেছিলেন যে সেখানে তার দুই বা তিনজন বন্ধু ছিল, “তারা আমাদের নিরাপত্তা দেয়।”

হ্যামলেট সাহা বলেন, হামলার শিকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পুলিশসহ বিভিন্ন স্থানে ফোন করে। তিনি বলেন, ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগে অভিযুক্ত আকাশ সাহা পালিয়ে যাওয়ায় অশোক সাহাকে পুলিশে সোপর্দ করা হবে বলে তাদের ধারণা।

হ্যামলেট বলেন, ‘আমরা যখন অশোক সাহাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করি, পুলিশ যখন তাকে নিয়ে চলে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে 500-600 জন, যাদের অনেককে আমি চিনতাম, যাদের অনেককেই আমি চিনতাম না। আমরা এই পাড়ায় 108টি ঘর নিয়ে থাকি। তারা প্রত্যেক বাড়িতে 10-12 জনের দলে আমাদের পাড়ায় প্রবেশ করেছিল। প্রতিটি বাড়ির দরজায় ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, টাকা দাও, না হলে বাড়িঘর ভেঙ্গে ফেলব, পুড়িয়ে দেব, মেরে ফেলব। যার টাকা ছিল, সে দিতে পেরেছে। তাদের ঘরবাড়ি ভাঙা হয়নি। আর যে সব বাড়ির লোকজন আগেই পালিয়ে গিয়েছিল, তারা সেসব বাড়ি ভেঙে একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনে একাত্তরের গল্প দেখে সেই রাতে তিনি ভয়াবহতা অনুভব করেছিলেন, হ্যামলেট সাহা বলেন, “সেখানে অনেক ভালো মানুষ ছিল। কিন্তু তারা নিষ্ক্রিয় ছিল। আমার মনে হয় খুব কম লোক আক্রমণ করেছিল কিন্তু অনেক লোক ছিল যারা নিষ্ক্রিয় ছিল। যার কারণে এত বড় ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ নেতারা গ্রামে ঢোকার আগেই হামলা শেষ হয়। ভুক্তভোগী জানান, ভাঙচুরের সময় লেগেছিল প্রায় ৩০ মিনিট। হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘বাজারে যখন লুটপাট হয়, তখন প্রশাসনের ১০-১২ জন লোক ছিল। ঠেকানো যায়নি বাজারের লুটপাট।

হ্যামলেট সাহা যোগ করেন, “আমরা আসলে আমাদের মা, বোন, খালাদের নিরাপদ করার চেষ্টা করছিলাম, যাতে সম্পদ যায়, সম্মান রক্ষা হয়।”

হ্যামলেট সাহা বলেন, “আমার বড় ভাই এই গ্রামে অনেক লোককে চাকরি দিয়েছেন। এই মানুষগুলো হঠাৎ করেই অপরিচিত হয়ে উঠেছে। আমার মনে হচ্ছে এই গ্রামটি আমার নয়।

হ্যামলেট সাহার বাবা শিবনাথ সাহা এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তি। হিন্দু-মুসলমান সকলের সালিশে তিনি উপস্থিত থাকেন। হ্যামলেট সাহা বলেন, “যখন বাবা এই জারজ সন্তানের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছিলেন, তখন বাবা এই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেননি। বাবা শুধু কেঁদেছিলেন। তারাও শুধু কেঁদেছিলেন।”

হ্যামলেট সাহার বক্তব্যের এ পর্যায়ে অনুষ্ঠানের আয়োজক বাংলাদেশ সিটিজেন প্লাটফর্ম ফর এসডিজি বাস্তবায়নের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কাছে জানতে চান, পরিচিত লোকজন বাড়িতে হামলা করেছে, তাদের সঙ্গে এখন সম্পর্ক কেমন?

জবাবে হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘আমাদের পাশেই একটা গ্রাম আছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে হামলা হতে পারে এমন খবর পেয়ে ওই গ্রামের নেতাকর্মীরা আমাদের পাহারা দিতে আসেন। যার জন্য যে ক্ষতি হওয়ার কথা ছিল, তা ওই গ্রামের মানুষের হয়নি। ওই গ্রামের সবাই এখন আমাদের গ্রাম পাহারা দিচ্ছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানতে চাইলেন, যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে। জবাবে হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘এটা আপনি ভালো করেই জানেন। আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করব না। কারণ দিন শেষে আমি সংখ্যালঘু। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। আমি সব বলতে পারব না

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

হামলাকারীরা বলছিল, টাকা দাও না হলে বাড়িঘর ভেঙে দেব।

আপডেট সময় ০৩:০৫:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৪ জুলাই ২০২২

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলায় হিন্দু বসতিতে হামলার বিবরণ দিয়ে একজন ভুক্তভোগী ফেসবুক পোস্টে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি আজ ঢাকায় এক সভায় যোগ দিয়ে সেই রাতের বর্বরতার কথা তুলে ধরেন। উপজেলার দিঘলিয়া গ্রামের বাসিন্দা হ্যামলেট সাহা জানান, হামলার সময় তাদের পরিচিত অনেকেই অপরিচিত হয়ে হাজির হয়।

হ্যামলেট বলেছিলেন যে যেভাবে সাম্প্রদায়িক অবমাননা দেওয়া হয়েছে, সে এখন তার গ্রাম এবং দেশের কাছে অপরিচিত বলে মনে হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এই সাম্প্রদায়িক হামলা থেকে আশেপাশের গ্রামের মুসলমানরা তাদের রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছে। পুলিশ আসার পরও হামলা না থামানোর বিষয়ে ঘটনার সময় হামলাকারীদের তুলনায় পুলিশের সংখ্যা খুবই কম বলে তিনি উল্লেখ করেন।

রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টারে ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতা: নাগরিক প্রতিক্রিয়া’ শীর্ষক সভায় বক্তব্য রাখেন দিঘলিয়ার সাহাপাড়ার বাসিন্দা হ্যামলেট সাহা। ১৫ জুলাই তাদের বাড়িতে হামলার মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটে।

ঘটনার বিবরণে হ্যামলেট সাহা বলেন, যে ফেসবুক আইডি থেকে ওইদিন গালাগালি করা হয় সেটি আগের দিন রাত আটটার দিকে খোলা হয়। পরদিন দুপুর আড়াইটার দিকে স্থানীয় লোকজন যারা বাজারে ছিল, তারা সবাই লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এরপর তারা সবাই দোকানপাট বন্ধ করে দেয়। তার বাবা শিবনাথ সাহা ওই গ্রামের সভাপতি। সবাই ভয়ে বাসায় চলে এলো। তখন তার বাবা সবাইকে শান্ত হতে বলেন। তারা নিজেরা এভাবে কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে ২০০ থেকে ৩০০ লোক দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আসে। তারা তার বাবাকে খুঁজতে থাকে।

হ্যামলেট বলল, ‘তখন আমি সামনে দাঁড়ালাম। তারা বলল, মালাউনের সন্তানরা, তোমরা আমাদের দেশের নবীর নামে এসব কথা বলছ। তখন আমি বললাম, এটা ফেক আইডি থেকে। তখন পেছন থেকে 17-18 বছর বয়সী ছেলেরা এসে বলল, আগে মাতবর ও তার ছেলেকে নিয়ে এসো। হ্যামলেট বলেছিলেন যে সেখানে তার দুই বা তিনজন বন্ধু ছিল, “তারা আমাদের নিরাপত্তা দেয়।”

হ্যামলেট সাহা বলেন, হামলার শিকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পুলিশসহ বিভিন্ন স্থানে ফোন করে। তিনি বলেন, ফেসবুকে কটূক্তির অভিযোগে অভিযুক্ত আকাশ সাহা পালিয়ে যাওয়ায় অশোক সাহাকে পুলিশে সোপর্দ করা হবে বলে তাদের ধারণা।

হ্যামলেট বলেন, ‘আমরা যখন অশোক সাহাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করি, পুলিশ যখন তাকে নিয়ে চলে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে 500-600 জন, যাদের অনেককে আমি চিনতাম, যাদের অনেককেই আমি চিনতাম না। আমরা এই পাড়ায় 108টি ঘর নিয়ে থাকি। তারা প্রত্যেক বাড়িতে 10-12 জনের দলে আমাদের পাড়ায় প্রবেশ করেছিল। প্রতিটি বাড়ির দরজায় ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, টাকা দাও, না হলে বাড়িঘর ভেঙ্গে ফেলব, পুড়িয়ে দেব, মেরে ফেলব। যার টাকা ছিল, সে দিতে পেরেছে। তাদের ঘরবাড়ি ভাঙা হয়নি। আর যে সব বাড়ির লোকজন আগেই পালিয়ে গিয়েছিল, তারা সেসব বাড়ি ভেঙে একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনে একাত্তরের গল্প দেখে সেই রাতে তিনি ভয়াবহতা অনুভব করেছিলেন, হ্যামলেট সাহা বলেন, “সেখানে অনেক ভালো মানুষ ছিল। কিন্তু তারা নিষ্ক্রিয় ছিল। আমার মনে হয় খুব কম লোক আক্রমণ করেছিল কিন্তু অনেক লোক ছিল যারা নিষ্ক্রিয় ছিল। যার কারণে এত বড় ঘটনা ঘটেছে।

স্থানীয় প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ নেতারা গ্রামে ঢোকার আগেই হামলা শেষ হয়। ভুক্তভোগী জানান, ভাঙচুরের সময় লেগেছিল প্রায় ৩০ মিনিট। হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘বাজারে যখন লুটপাট হয়, তখন প্রশাসনের ১০-১২ জন লোক ছিল। ঠেকানো যায়নি বাজারের লুটপাট।

হ্যামলেট সাহা যোগ করেন, “আমরা আসলে আমাদের মা, বোন, খালাদের নিরাপদ করার চেষ্টা করছিলাম, যাতে সম্পদ যায়, সম্মান রক্ষা হয়।”

হ্যামলেট সাহা বলেন, “আমার বড় ভাই এই গ্রামে অনেক লোককে চাকরি দিয়েছেন। এই মানুষগুলো হঠাৎ করেই অপরিচিত হয়ে উঠেছে। আমার মনে হচ্ছে এই গ্রামটি আমার নয়।

হ্যামলেট সাহার বাবা শিবনাথ সাহা এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তি। হিন্দু-মুসলমান সকলের সালিশে তিনি উপস্থিত থাকেন। হ্যামলেট সাহা বলেন, “যখন বাবা এই জারজ সন্তানের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছিলেন, তখন বাবা এই যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেননি। বাবা শুধু কেঁদেছিলেন। তারাও শুধু কেঁদেছিলেন।”

হ্যামলেট সাহার বক্তব্যের এ পর্যায়ে অনুষ্ঠানের আয়োজক বাংলাদেশ সিটিজেন প্লাটফর্ম ফর এসডিজি বাস্তবায়নের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কাছে জানতে চান, পরিচিত লোকজন বাড়িতে হামলা করেছে, তাদের সঙ্গে এখন সম্পর্ক কেমন?

জবাবে হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘আমাদের পাশেই একটা গ্রাম আছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে হামলা হতে পারে এমন খবর পেয়ে ওই গ্রামের নেতাকর্মীরা আমাদের পাহারা দিতে আসেন। যার জন্য যে ক্ষতি হওয়ার কথা ছিল, তা ওই গ্রামের মানুষের হয়নি। ওই গ্রামের সবাই এখন আমাদের গ্রাম পাহারা দিচ্ছে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানতে চাইলেন, যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে। জবাবে হ্যামলেট সাহা বলেন, ‘এটা আপনি ভালো করেই জানেন। আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করব না। কারণ দিন শেষে আমি সংখ্যালঘু। আমাকে বাড়ি ফিরতে হবে। আমি সব বলতে পারব না