০৫:৪২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ মে ২০২৪

‘বুকের ধন ছাড়া বাঁচতে পারি না’

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৬:৫৯:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুন ২০২২
  • / ৮৫৭ বার পড়া হয়েছে

bdopennews

আমার উৎপল বধূ চলে গেছে। হে উৎপল। আপনি কনের কাছে গিয়েছিলেন। আমি আমার বুকে ধন ছাড়া বাঁচতে পারি না। তুমি আমাকে বাটকের অধিকার দাও। সান্ত্বনা দিতে আসা প্রতিবেশীরাও কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

সোমবার বিকেলে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার লাহিড়ী মোহনপুর ইউনিয়নের এলংজানি গ্রামের উৎপল কুমারের বাড়িতে এ দৃশ্য দেখা যায়। সাভারের ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ। গত শনিবার দুপুরে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাকে মারধর করা হয়। সোমবার সকালে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়

উৎপল সরকারের মা বিলাপ করে বলেন, “আমার ছেলে প্রতিদিন রাতে ফোন করে। আমগোরে খবর লিখেছে। শুনেছি এখন ছেলে নেই…।’ কাঁদতে কাঁদতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন বৃদ্ধা মা গীতা রানী।

উৎপলের বড় ভাইয়ের স্ত্রী মলি রানী সরকার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিডি ওপেন নিউজকে বলেন, রাত ৯টার দিকে উৎপল কুমারের মরদেহ ঢাকার সাভার থেকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা ছিল। রাতে লাহিড়ী মোহনপুর শ্মশানে তার শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

দেবর হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে মলি রানী সরকার বলেন, ছাত্র শৃঙ্খলার কারণে শিক্ষকদের এভাবে মরতে হলে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর শৃঙ্খলা থাকত না। শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে।

প্রভাষক উৎপল কুমারের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসছেন তার বড় ভাই অসীম কুমার। তিনি মুঠোফোনে বিডি ওপেন নিউজকে বলেন, আমরা পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। সে আমার মায়ের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। আমার প্রিয় ভাইকে যদি শিক্ষা দিতে জীবন দিতে হয়, এর চেয়ে দুঃখের ও বেদনার আর কী হতে পারে? আমি আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই। “

উৎপল কুমার সরকার উল্লাপাড়া উপজেলার এলংজানি গ্রামের মৃত অজিত সরকারের ছেলে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে ১০ বছর আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সংগঠনের শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। মারধরের অভিযুক্ত ছাত্রের (১৮) বাড়ি আশুলিয়ায়। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির ছাত্র।

নিহত শিক্ষকের পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও কলেজে মেয়েদের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। শনিবার বিকেলে খেলা চলাকালীন দশম শ্রেণির ছাত্র ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে শিক্ষক উৎপল সরকারের ওপর হামলা চালায়। প্রথমে ছাত্রটি শিক্ষকের মাথায় আঘাত করে এবং পরে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। এটি স্টাম্পের ধারালো অংশের সাথে পেটের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। পরে শিক্ষকরা এগিয়ে এলে সেখান থেকে পড়ে যায় ওই শিক্ষার্থী। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উৎপল সরকারকে প্রথমে আশুলিয়া মহিলা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। আহতদের সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সোমবার সকালে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তিনি মারা যান।

হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান জানান, দুপুরে মেয়েদের ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালীন শিক্ষক উৎপল সরকার একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে অনেকেই তাকে জানিয়েছেন। এ সময় দশম শ্রেণির ওই ছাত্র তাকে ক্রিকেটের স্টাম্প দিয়ে মারধর করে। উৎপল সরকার শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান থাকায় তিনি শিক্ষার্থীদের আচরণগত সমস্যার কাউন্সেলিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ নিতেন। ঠিক কী কারণে ওই ছাত্র এমন ঘটনা ঘটিয়েছে তা এখনো কেউ বলতে পারছেন না।

উৎপলের ভাই অসীম কুমার সরকার জানান, তার ভাই ছাত্রদের নীতি-নৈতিকতা দেখাশোনা করতেন। দশম শ্রেণির ছাত্রীদের হয়রানিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তাকে কয়েকবার সংশোধন করা হলেও তাকে সংশোধন করা হয়নি। উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে তার ভাইকে স্তূপ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

‘বুকের ধন ছাড়া বাঁচতে পারি না’

আপডেট সময় ০৬:৫৯:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুন ২০২২

আমার উৎপল বধূ চলে গেছে। হে উৎপল। আপনি কনের কাছে গিয়েছিলেন। আমি আমার বুকে ধন ছাড়া বাঁচতে পারি না। তুমি আমাকে বাটকের অধিকার দাও। সান্ত্বনা দিতে আসা প্রতিবেশীরাও কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

সোমবার বিকেলে সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার লাহিড়ী মোহনপুর ইউনিয়নের এলংজানি গ্রামের উৎপল কুমারের বাড়িতে এ দৃশ্য দেখা যায়। সাভারের ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ। গত শনিবার দুপুরে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাকে মারধর করা হয়। সোমবার সকালে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়

উৎপল সরকারের মা বিলাপ করে বলেন, “আমার ছেলে প্রতিদিন রাতে ফোন করে। আমগোরে খবর লিখেছে। শুনেছি এখন ছেলে নেই…।’ কাঁদতে কাঁদতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন বৃদ্ধা মা গীতা রানী।

উৎপলের বড় ভাইয়ের স্ত্রী মলি রানী সরকার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিডি ওপেন নিউজকে বলেন, রাত ৯টার দিকে উৎপল কুমারের মরদেহ ঢাকার সাভার থেকে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা ছিল। রাতে লাহিড়ী মোহনপুর শ্মশানে তার শেষকৃত্যের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

দেবর হত্যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করে মলি রানী সরকার বলেন, ছাত্র শৃঙ্খলার কারণে শিক্ষকদের এভাবে মরতে হলে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর শৃঙ্খলা থাকত না। শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে।

প্রভাষক উৎপল কুমারের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসছেন তার বড় ভাই অসীম কুমার। তিনি মুঠোফোনে বিডি ওপেন নিউজকে বলেন, আমরা পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট। সে আমার মায়ের সবচেয়ে প্রিয় সন্তান। শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। আমার প্রিয় ভাইকে যদি শিক্ষা দিতে জীবন দিতে হয়, এর চেয়ে দুঃখের ও বেদনার আর কী হতে পারে? আমি আমার ভাইয়ের হত্যার বিচার চাই। “

উৎপল কুমার সরকার উল্লাপাড়া উপজেলার এলংজানি গ্রামের মৃত অজিত সরকারের ছেলে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে ১০ বছর আশুলিয়ার চিত্রশাইল এলাকার হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সংগঠনের শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। মারধরের অভিযুক্ত ছাত্রের (১৮) বাড়ি আশুলিয়ায়। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির ছাত্র।

নিহত শিক্ষকের পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও কলেজে মেয়েদের ক্রিকেট টুর্নামেন্টের আয়োজন করা হয়েছে। শনিবার বিকেলে খেলা চলাকালীন দশম শ্রেণির ছাত্র ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে শিক্ষক উৎপল সরকারের ওপর হামলা চালায়। প্রথমে ছাত্রটি শিক্ষকের মাথায় আঘাত করে এবং পরে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। এটি স্টাম্পের ধারালো অংশের সাথে পেটের বিভিন্ন অংশে আঘাত করে। পরে শিক্ষকরা এগিয়ে এলে সেখান থেকে পড়ে যায় ওই শিক্ষার্থী। আশঙ্কাজনক অবস্থায় উৎপল সরকারকে প্রথমে আশুলিয়া মহিলা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। আহতদের সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সোমবার সকালে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তিনি মারা যান।

হাজী ইউনুস আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সাইফুল হাসান জানান, দুপুরে মেয়েদের ক্রিকেট ম্যাচ চলাকালীন শিক্ষক উৎপল সরকার একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে অনেকেই তাকে জানিয়েছেন। এ সময় দশম শ্রেণির ওই ছাত্র তাকে ক্রিকেটের স্টাম্প দিয়ে মারধর করে। উৎপল সরকার শৃঙ্খলা কমিটির চেয়ারম্যান থাকায় তিনি শিক্ষার্থীদের আচরণগত সমস্যার কাউন্সেলিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে পদক্ষেপ নিতেন। ঠিক কী কারণে ওই ছাত্র এমন ঘটনা ঘটিয়েছে তা এখনো কেউ বলতে পারছেন না।

উৎপলের ভাই অসীম কুমার সরকার জানান, তার ভাই ছাত্রদের নীতি-নৈতিকতা দেখাশোনা করতেন। দশম শ্রেণির ছাত্রীদের হয়রানিসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তাকে কয়েকবার সংশোধন করা হলেও তাকে সংশোধন করা হয়নি। উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে তার ভাইকে স্তূপ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।